ইসলামে ইদে মিলাদুন্নবী ? — বিদআতের কঠিন বাস্তবতা

0
ইসলামে ইদে মিলাদুন্নবী ? — বিদআতের কঠিন বাস্তবতা | Ofde Islam

ইসলামে ইদে মিলাদুন্নবী ? — বিদআতের কঠিন বাস্তবতা  

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে দ্বীন সম্পূর্ণ করা হয়েছে এবং কোনো কিছুতে ঘাটতি নেই। এই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের মধ্যে কী বৈধ আর কী অবৈধ, তা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
কিন্তু যুগে যুগে মানুষ দ্বীনের সাথে নতুন কিছু যোগ করার চেষ্টা করেছে। এসব সংযোজনই ইসলামে বিদআত নামে পরিচিত।
এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে—তথাকথিত “ইদে মিলাদুন্নবী” বা নবীজির জন্মদিন পালনের রীতি আসলে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত কি না, এবং কেন মূলধারার আলেমরা এটিকে বিদআত বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ইদে মিলাদুন্নবী কী?

“মিলাদ” অর্থ জন্ম। আর মিলাদুন্নবী বলতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জন্মদিন বোঝানো হয়।
সাধারণত ১২ রবিউল আউয়ালকে এই দিন ধরা হয়। এ উপলক্ষে অনেক মুসলিম সমাজে সমাবেশ করা হয়—কুরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাত, দোয়া, শিরনি বা মিষ্টি বিতরণ ইত্যাদি।
অনেক জায়গায় এটি উৎসবের রূপ নেয়—আতশবাজি, মিছিল, গান-বাজনা পর্যন্ত হয়।

প্রশ্ন হলো: এটি কি শরীয়তের অংশ? রাসূল ﷺ, সাহাবা এবং প্রাচীন আলেমরা কি এমন কিছু করেছেন?
কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে দ্বীন পূর্ণাঙ্গ হওয়ার ঘোষণা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
> “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।”
(সূরা মায়িদাহ ৫:৩)
এই আয়াত প্রমাণ করে, দ্বীন সম্পূর্ণ হয়েছে রাসূল ﷺ এর জীবদ্দশায়। এরপর নতুন কোনো ইবাদত বা উৎসব আবিষ্কার করা দ্বীনের অংশ নয়।

রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনে এমন কিছু সংযোজন করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়—তা প্রত্যাখ্যাত।”
(সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম)

“সর্বশ্রেষ্ঠ কথা আল্লাহর কিতাব, সর্বশ্রেষ্ঠ দিশা মুহাম্মদের দিশা। আর সব নতুন উদ্ভাবন বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা।”
(সহীহ মুসলিম)

রাসূল ﷺ ও সাহাবাদের আমল
রাসূল ﷺ কখনো তাঁর জন্মদিন পালন করেননি।
সাহাবারা—আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রাঃ)—কেউই এটি পালন করেননি।
তাঁদের ভালোবাসা প্রকাশের উপায় ছিল সুন্নাহ মানা, জন্মদিন পালন নয়।
যদি এটি কল্যাণকর হতো, সাহাবারা অবশ্যই পালন করতেন।

ঐতিহাসিক প্রমাণ

মিলাদের সূচনা
প্রথম তিন শতাব্দীতে ইসলামের ইতিহাসে মিলাদ উদযাপনের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। রাসূল ﷺ, সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনরা এর কোনো চর্চা করেননি।

ফাতেমীয়দের ভূমিকা
ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন, ইবনে কাসীর, আল-মাকরিজী প্রমুখ একমত যে—চতুর্থ হিজরি শতকে মিশরের ফাতেমীয় শিয়া শাসকরা প্রথমবারের মতো মিলাদ উদযাপন চালু করে।

তারা শুধু মিলাদুন্নবী নয়, বরং আলী (রাঃ), ফাতিমা (রাঃ), হাসান (রাঃ), হুসাইন (রাঃ) এবং নিজেদের ইমামদের জন্মদিনকেও "ঈদ" বানিয়ে উদযাপন করত।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
ফাতেমীয় শাসকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় ভক্তিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব শক্তিশালী করা।
তারা জনগণকে প্রভাবিত করার জন্য নতুন উৎসব চালু করে, যাতে তাদের শাসনের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন জোরদার হয়।

ইতিহাসবিদদের সাক্ষ্য
ইবনে খালদুন (মুকাদ্দিমাহ) লিখেছেন:
“ফাতেমীয় শাসকেরা তাদের শাসন টিকিয়ে রাখতে এবং জনগণের আনুগত্য অর্জনের জন্য মিলাদসহ নানা উৎসব চালু করে।”

ইবনে কাসীর (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া) উল্লেখ করেছেন:
“মিলাদের সূচনা ফাতেমীয় শিয়াদের হাতে, আর তাদের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করা।”

অতএব, স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো—
রাসূল ﷺ এর ওফাতের প্রায় ৩০০ বছর পরে মিলাদ চালু হয়।
এর প্রথম প্রচলন ঘটে ফাতেমীয় শিয়া শাসনামলে।
এটি ছিল নিছক একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন, ইসলামী শরীয়তের কোনো অংশ নয়।

আলেমদের মতামত
ইমাম মালেক (রহ.), ইমাম শাফেয়ী (রহ.), ইমাম আহমদ (রহ.), ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাসীর, ইমাম শওকানীসহ অসংখ্য আলেম বলেছেন—মিলাদ উদযাপন বিদআত।

তাঁদের যুক্তি:
1. রাসূল ﷺ, সাহাবা ও তাবেঈনরা করেননি।
2. কুরআন-হাদিসে কোনো নির্দেশ নেই।
3. দ্বীন সম্পূর্ণ হওয়ার পর নতুন ইবাদত উদ্ভাবন করা শরীয়তের পরিপন্থী।

শর্তসাপেক্ষ অনুমোদন
কিছু সুফি আলেম বলেছেন—যদি শুধু কুরআন তিলাওয়াত, নবীর জীবন আলোচনা, দোয়া ইত্যাদি হয় তবে সেটা নেকির কাজ হতে পারে। কিন্তু একে ঈদ বানানো যাবে না, বাধ্যতামূলক মনে করা যাবে না।

বিরোধীদের যুক্তি ও জবাব
1. “আমরা তো নবীর ভালোবাসায় মিলাদ করি।”
ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ হলো সুন্নাহ মানা। নতুন উৎসব উদ্ভাবন ভালোবাসা নয়।
2. “ভালো কাজ হলে সমস্যা কী?”
ইবাদতের মান নির্ধারণ করবেন আল্লাহ ও রাসূল ﷺ। মানুষের ইচ্ছায় নতুন ইবাদত বানানো বৈধ নয়।
3. “এতে তো কুরআন পড়া ও দোয়া হয়।”
কুরআন পড়া, দোয়া করা সারা বছরই জায়েজ। এর জন্য আলাদা দিন নির্ধারণ করা দ্বীনে সংযোজন।

ইসলামে আসল ঈদ
রাসূল ﷺ বলেছেন:
> “মুসলমানদের জন্য দুটি ঈদ—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা।”
সুতরাং “ইদে মিলাদুন্নবী” নামে নতুন ঈদ উদ্ভাবন শরীয়তের বিরোধী।

ইদে মিলাদুন্নবী পালনের কোনো ভিত্তি কুরআন ও সহীহ হাদিসে নেই।
রাসূল ﷺ, সাহাবা, তাবেঈন বা প্রাচীন ইমামরা কখনো এটি পালন করেননি।
এটি পরবর্তীতে উদ্ভাবিত একটি প্রথা, যার উৎস ইসলামী শরীয়তে নয়।

📌 মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য হলো—বিদআত থেকে বিরত থাকা, সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, আর নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রমাণ করা তাঁর দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে।

Ofde islam
Al Hamim Hossain
Guest Writer - ঢাকা


Post a Comment

0Comments

Thanks everyday

Post a Comment (0)
To Top