শিয়া মতবাদের সূচনা কবে এবং কীভাবে ঘটেছিল—এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমার মাঝে যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, তখন যাঁরা হযরত আলীর পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন, তাঁরা-ই ‘শিয়া’; আর যাঁরা হযরত মুয়াবিয়ার (রাঃ) অনুসারী ছিলেন, তাঁরাই ‘সুন্নি’। অর্থাৎ—এই মতে—হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমার অনুসারীগণই যথাক্রমে শিয়া ও সুন্নি নামে পরিচিত হন। কিন্তু বিজ্ঞ আলেম ও নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদগণ এ ধরনের সরলীকৃত ব্যাখ্যাকে কখনোই গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকীদা অনুযায়ী, হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমা উভয়েই ছিলেন প্রথম সারির সম্মানিত সাহাবি। তাঁদের মাঝে যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল, তা ইজতিহাদী বিষয়ে ছিল (বোঝের ভিন্নতার কারণে)। এই ক্ষেত্রে হযরত আলীর সিদ্ধান্ত ছিল যথাযথ ও গ্রহণযোগ্য; অপরদিকে হযরত মুয়াবিয়ার ইজতিহাদ এখানে সঠিক না হলেও তা নিছক ভুল হিসেবে গণ্য হয়, গোনাহ হিসেবে নয়।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকীদা অনুযায়ী, হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুমা উভয়েই ছিলেন প্রথম সারির সম্মানিত সাহাবি। তাঁদের মাঝে যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল, তা ইজতিহাদী বিষয়ে ছিল (বোঝের ভিন্নতার কারণে)। এই ক্ষেত্রে হযরত আলীর সিদ্ধান্ত ছিল যথাযথ ও গ্রহণযোগ্য; অপরদিকে হযরত মুয়াবিয়ার ইজতিহাদ এখানে সঠিক না হলেও তা নিছক ভুল হিসেবে গণ্য হয়, গোনাহ হিসেবে নয়।
এ থেকে স্পষ্ট হয় যে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ হযরত আলী রাঃ কে সমর্থন করেছেন,
অপরদিকে হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি ভিন্ন কোন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না।
তদ্ব্যতীত, বর্তমান যুগের অধিকাংশ শিয়া সম্প্রদায় যে বিশ্বাস ও আচার-আচরণে অভ্যস্ত, তা কোনোভাবেই হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই কারণে বলা যায়, ‘শিয়া মতবাদের উৎপত্তি হযরত আলীর যুগে হয়েছে’—এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য ও ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
শিয়া মতবাদের প্রকৃত সূচনা!
বিভিন্ন ইতিহাসবেত্তাদের মতে, শিয়া মতবাদের প্রকৃত সূচনা হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত-পরবর্তী সময়েই ঘটে। এ মতটি তুলনামূলকভাবে অধিক স্পষ্ট ও ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কারণ, যখন হযরত হুসাইন ইয়াযিদের খেলাফত স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন ইরাকের কিছু মানুষ তাঁকে সমর্থনের আশ্বাস দিয়ে আহ্বান জানায়। তাঁদের সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে হযরত হুসাইন ইরাকগামী হন। শুরুতে তারা তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও শেষপর্যন্ত তাঁকে একাকী ছেড়ে দেয়, যার পরিণতিতে কারবালার প্রান্তরে হযরত হুসাইন নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন।
ইতিহাসের পাতায় ‘শিয়া’ শব্দের প্রথম ব্যবহার !
এই বিশ্বাসঘাতকতায় ইরাকবাসীর অন্তরে তীব্র অনুশোচনা জন্ম নেয়। নিজেদের পাপ মোচনের প্রত্যাশায় একসময় তারা উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই বিদ্রোহে অংশ নিতে গিয়ে তাঁদের অনেকেই প্রাণ হারায়। ইতিহাসের পাতায় এই বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে ‘শিয়া’ শব্দটি প্রথমবার ব্যবহৃত হয়—এমনটাই জানা যায় বহু ঐতিহাসিক সূত্র থেকে।
এখান থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা প্রতিভাত হয়: হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেয়ে তাঁর পুত্র হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গেই শিয়া সম্প্রদায়ের আত্মিক ও মানসিক সম্পর্ক অধিক ঘনিষ্ঠ। সম্ভবত এ কারণেই বর্তমান যুগের শিয়ারা হযরত হুসাইনের শাহাদাতকে ঘিরে ব্যাপক আয়োজন করে থাকে, অথচ হযরত আলীর স্মরণে তেমন কিছু করে না—এমনকি অনেকক্ষেত্রে তাঁকে উপেক্ষাই করে।
সবশেষে বলা যায়, এই মতবাদ শুরুতে নিছক একটি রাজনৈতিক দল হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ ও বিদ্রোহীদের সমর্থন জোগানো। সূচনালগ্নে তাদের আকীদাগত অবস্থান কিংবা ফিকহ-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির কোনো দিকই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল না। বরং যাঁদের তারা প্রথম দিকের ইমাম বলে মনে করে, তাঁদের সবাই ছিলেন সুন্নি আকীদার পূর্ণ অনুসারী।
সাহাবা তাবীদের পূর্ণ অনুসারী শিয়াদের প্রথম সারির কয়েকজন ইমাম !
হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের কয়েক মাস পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। তবে তাঁর পুত্র, আলী যাইনুল আবিদীন রহিমাহুল্লাহর যুগে তা আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আলী যাইনুল আবিদীন ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব—একান্ত দুনিয়াবিমুখ, ইবাদতে পরিপূর্ণ ও জ্ঞানী আলেম হিসেবে সমগ্র তাবেয়ী সমাজে প্রসিদ্ধ। তাঁর জীবন ও চিন্তায় এমন কিছুই ছিল না, যা সাহাবী ও তাবেয়ীদের আকীদা ও পথের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বা বিরোধপূর্ণ ছিল।
এই মহৎ মনীষীর ঘর থেকেই জন্ম নিয়েছিলেন আরও দুই মহান ব্যক্তি—হযরত মুহাম্মদ আল-বাকির এবং হযরত যায়েদ রহিমাহুমাল্লাহ। উভয়ের তাকওয়া, ইলম ও পরহেযগারিতা ছিল অনন্য উচ্চতায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর তৎকালীন প্রতিনিধিত্বকারী সাহাবী ও তাবেয়ীদের সঙ্গে তাঁদের কোনো আকীদাগত দ্বিমত ছিল না, বরং তাঁরা একই ধারার অনুসারী ছিলেন।
তবে একটি ক্ষেত্রে হযরত যায়েদ ইবনু আলী রহিমাহুল্লাহর একটি ব্যক্তিগত মতভেদ ছিল। তিনি মনে করতেন, হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই ছিলেন খিলাফতের সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি। এই মত দুটি কারণে লক্ষণীয়। প্রথমত, এটি উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে; দ্বিতীয়ত, অসংখ্য হাদীসে প্রমাণিত যে, হযরত আবু বকর, হযরত উমর ও হযরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুম ছিলেন মর্যাদায় অগ্রগণ্য।
তবুও হযরত যায়েদের এই মত কোনো আকীদাগত গোমরাহী ছিল না। তিনি কখনোই প্রথম তিন খলীফার মর্যাদা অস্বীকার করেননি; বরং তাঁদের সম্মান বজায় রেখেই হযরত আলীকে তাঁদের চেয়ে অগ্রগণ্য মনে করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে ইমামত বা নেতৃত্বের যোগ্যতা বড় হওয়াই মুখ্য ছিল, বয়স বা অগ্রাধিকার নয়। তাই, যদিও তাঁর এই মত আহলুস সুন্নাহর মূলনীতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, তথাপি এটি কোনো বিদআতি অবস্থান ছিল না।
সবশেষে বলা যায়, শরিয়তের মৌলিক বিশ্বাস ও ফিকহের শাখাগত বিষয়ে হযরত যায়েদ রহিমাহুল্লাহর আহলুস সুন্নাহর সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না। মতপার্থক্য ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ঘিরে।
‘যায়দিয়া’ বা ‘যায়েদী’ মতবাদের উৎপত্তি !
হযরত যায়েদ ছিলেন হযরত হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর পৌত্র। তিনি খলীফা হিশাম ইবনু মালিকের শাসনামলে দাদার পথ অনুসরণ করে একদল ভক্তকে সঙ্গে নিয়ে উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
অবশেষে ১২২ হিজরিতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর ফলে অনুসারীদের মনোবল সাময়িকভাবে ক্ষীণ হলেও, পরবর্তী কালে তাঁর আদর্শ ও চিন্তাধারার ভিত্তিতে এক নতুন ধারার মতবাদ আত্মপ্রকাশ করে। ইতিহাসে সেটি ‘যায়দিয়া’ বা ‘যায়েদী’ মতবাদ নামে পরিচিত।
বর্তমানে যায়দিয়া সম্প্রদায় প্রধানত ইয়েমেনে বসবাস করে। যদিও তাদেরকে সাধারণত শিয়া বলা হয়ে থাকে, তবুও বাস্তবে তারা শিয়াদের মূলধারার সঙ্গে খুব বেশি মিল রাখে না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর সঙ্গে তাদের মূল মতভেদ কেবল একটি বিষয়ে—তাদের দৃষ্টিতে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন হযরত আবু বকর, উমর ও উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুমের চেয়ে অধিক হকদার। এই মতভেদ ছাড়া বিশ্বাস, ফিকহ ও ইবাদতের অন্যান্য বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহর কাছাকাছি।
এমনকি বাস্তবতায় এমন দেখা যায় যে, যায়দিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে আহলুস সুন্নাহর মাঝে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্যই খুঁজে পাওয়া যায় না। এ কারণে ইসলামি চিন্তাবিদদের অনেকে তাদেরকে ‘শিয়া-সুলভ সুন্নি’ বলেও অভিহিত করেছেন।
শিয়া (ইসনা-আশারিয়া) মতবাদের জন্ম !
একবার হযরত যায়েদ রহিমাহুল্লাহর অনুসারীদের একটি দল তাঁর কাছে গিয়ে সাহাবি হযরত আবু বকর ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চায়। তিনি তাঁদের প্রশংসা করেন এবং তাদের জন্য দোয়া করেন। এতে ঐ অনুসারী দল প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় ও তাঁর সেই দোয়া প্রত্যাখ্যান করে। এখানেই শেষ নয়, তারা উক্ত দুই মহৎ সাহাবির বিরুদ্ধে কটূক্তি করতে থাকে, এমনকি শেষ পর্যন্ত হযরত যায়েদের আনুগত্য থেকেও বিচ্যুত হয়ে যায়।
ফলে ইতিহাসে এই দলটি পরিচিত হয় ‘রাফিজী’ (অস্বীকরণকারী/বিদ্রোহী) নামে। একদিকে তারা যেমন সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা অস্বীকার করেছে, তেমনি হযরত যায়েদের মতো একজন সম্মানিত মনীষীর পথ থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। একের পর এক এই বিদ্রোহ ও বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতায় এই দলের এক অনুসারীর হাত ধরেই পরবর্তীতে গড়ে ওঠে ‘ইসনা আশারিয়া’ মতবাদ—বর্তমান যুগের সর্বাধিক প্রচলিত শিয়া মতবাদ।
অন্যদিকে হযরত যায়েদ ইবনু আলীর আট বছর পূর্বে—১১৪ হিজরিতে—তাঁর ভাই হযরত মুহাম্মদ আল-বাকির রহিমাহুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। তিনি রেখে যান সাতজন সন্তান,
তাদের মধ্যে ছিলেন মহামনীষী—জাফর আস-সাদিক রহিমাহুল্লাহ। তিনি ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও ফকীহ। আকীদা-বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি ছিলেন সাহাবি, তাবেয়ী ও তৎকালীন বিশুদ্ধ ধারার আলেমদের পথের পরিপূর্ণ অনুসারী।
এদিকে সময়ের স্রোতে উমাইয়া শাসনের শেষ মুহূর্ত এগিয়ে আসে। এ সুযোগে আব্বাসী বংশদররা উমাইয়াদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টিতে সচেষ্ট হয়। তারা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠন করে এবং শাসনের প্রতি সর্বস্তরে তীব্র ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়। এই বিদ্রোহের আগুনে ঘি ঢালে সেই দলটি, যারা একসময় হযরত যায়েদ রহিমাহুল্লাহর পথ ত্যাগ করেছিল এবং তাঁর আদর্শকে বিকৃত করেছিল।
১৩২ হিজরিতে উমাইয়া খেলাফতের পতনের মধ্য দিয়ে আব্বাসী খেলাফতের সূচনা ঘটে। প্রথম খলীফা হন আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ, আর তাঁর পর দায়িত্ব গ্রহণ করেন খলীফা আবু জাফর আল-মানসুর।
কিন্তু শুরুর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো আবিষ্কার করে, তাদের শ্রম-সংগ্রাম ছিল নিষ্ফল। কারণ, তারা আশা করেছিল খেলাফতের নেতৃত্ব হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বংশধরদের হাতে যাবে; কিন্তু বাস্তবে তা চলে যায় আব্বাসী বংশের হাতে। এতে আশাভঙ্গ ও হতাশা ঘনিয়ে আসে তাদের মাঝে।
ফলত তারা পুনরায় বিদ্রোহের তোড়জোড় শুরু করে। এবার তারা নিজেদের নাম দেয় ‘তালিবী’—যা হযরত আলী ইবনু আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর নামের অনুসরণে রাখা হয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা যতই ছড়িয়ে পড়ুক, তখনও পর্যন্ত উম্মাহর মাঝে আকীদা ও ফিকহের মৌলিক বিষয়ে বড় কোনো মতভেদ গড়ে ওঠেনি। কিন্তু সেই পুরনো বিদ্রোহী দলটি এবার আরেক ধাপ এগিয়ে যায়—তারা হযরত আবু বকর ও হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমার বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে। তাঁদের নেতৃত্ব ও মর্যাদা প্রকাশ্যে অস্বীকার করে, এমনকি তাঁদের নাম ধরে বদদোয়াও শুরু করে দেয়।
অপরদিকে, জাফর আস-সাদিক রহিমাহুল্লাহ ১৪৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তিনি উত্তরসূরি হিসেবে রেখে যান তাঁর পুত্র মুসা আল-কাজিমকে। তিনিও দীনি শিক্ষায় সুদক্ষ ছিলেন, তবে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পিতার সমপর্যায়ের নন।
মুসা আল-কাজিম রহিমাহুল্লাহ ১৮৩ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তিনি একটি বড় ও মর্যাদাবান পরিবার রেখে যান, যার মধ্যে তাঁর পুত্র আলী ইবনু মুসা রেজা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর জ্ঞান, আখলাক ও পারিবারিক বংশপরিচয় তাঁকে জনগণের দৃষ্টিতে সম্মানিত করে তোলে।
এদিকে তালিবী দল যখন পুনরায় বিদ্রোহের আওয়াজ তুলে, তখন আব্বাসী খেলাফতের দায়িত্বে ছিলেন খলীফা আবু জাফর আব্দুল্লাহ আল-মামুন। তিনি এ বিদ্রোহকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেন এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমন ও দলগুলোর অভিযোগ সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তালিবীদের প্রধান দাবি ছিল—খেলাফতের নেতৃত্ব হযরত আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিবের বংশে নয়, বরং হযরত আলী ইবনু আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর বংশধরে হস্তান্তর করা হোক। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে খলীফা আল-মামুন খেলাফতের বায়আতের জন্য আলী ইবনু মুসা রেজাকে মনোনীত করেন।
এই সিদ্ধান্ত আব্বাসী পরিবারের অভ্যন্তরে প্রচণ্ড উত্তেজনার সৃষ্টি করে। অনেকে মনে করতে শুরু করে, এ সিদ্ধান্ত তাঁদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হুমকির মুখে ফেলতে পারে। অবশেষে ২০৩ হিজরিতে আকস্মিকভাবে আলী ইবনু মুসা রেজা রহিমাহুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অনুসারীরা এই মৃত্যুর জন্য সরাসরি খলীফা আল-মামুনকেই দোষারোপ করে। ক্রুদ্ধ জনতা পুনরায় বিদ্রোহের ডাক দেয়—ঠিক যেমনটি একদা উমাইয়া খেলাফতের বিরুদ্ধেও হয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক বছর অস্থিরতা ও বিদ্রোহের মধ্যে কেটে যায়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়। এই দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্রোহ, রাজনীতিক দ্বন্দ্ব ও শাসকদের প্রতি ক্ষোভ থাকলেও, ‘শিয়া’ নামে কোনো স্বতন্ত্র ধর্মীয় বা আকীদাগত মতবাদ তখনও গড়ে ওঠেনি। যত বিদ্রোহ-সংগ্রাম ঘটেছে, সবই ছিল রাজনৈতিক বা ক্ষমতা-কেন্দ্রিক; ধর্মীয় আকীদার ভিত্তিতে নয়।
প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান সময়ের শিয়াদের সঙ্গে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর যে মৌলিক আকীদাগত মতভেদ দেখা যায়, তার কোনোটিই ঐ সময়কার বিদ্রোহী দলগুলোর মধ্যে ছিল না। কারণ, মূল দ্বন্দ্ব তখন ছিল নেতৃত্ব ও খেলাফতের দাবিকে কেন্দ্র করে, দীন ও আকীদার নয়।
উল্লেখ্য, এইসব বিদ্রোহ ও সংগ্রামে পারস্যবাসীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। একদা বিশাল ও গৌরবোজ্জ্বল পারস্য সাম্রাজ্য ইসলামী খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত হলে অনেক পারস্যবাসী সেই পরিবর্তন সহজে মেনে নিতে পারেনি। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৌলীন্যের দিক দিয়ে তারা নিজেদেরকে আরবদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করত; ফলে নেতৃত্ব আরবদের হাতে দেখে তাদের মাঝে হিংসা, ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জন্ম নেয়। এ-ই ছিল বহু গভীর দ্বন্দ্বের নেপথ্য প্রণোদনা
ফিরে যাই তালিবী আন্দোলনের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায়।
আমরা পূর্বে জেনেছি, আলী ইবনু মুসা রেজাকে বায়আতের জন্য মনোনীত করার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর নেতৃত্বে আসেন তদীয় পুত্র মুহাম্মদ আল-জাওয়াদ, যিনি ২২০ হিজরীতে পরলোকগমন করেন। এরপর তাঁর পুত্র আলী ইবনু মুহাম্মদ আল-হাদী নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ২৫৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। সর্বশেষ এই ধারায় নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন হাদীপুত্র হাসান ইবনু আলী, যাঁর উপাধি ছিল ‘আল-আসকারী’। তিনি ২৬০ হিজরীতে মৃত্যু বরণ করেন এবং পেছনে মুহাম্মদ নামের মাত্র পাঁচ বছরের এক শিশুপুত্র রেখে যান।
বিগত বছরগুলোতে খেলাফতের বিরুদ্ধে চলমান বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে আহলে বাইতের তালিবী অনুসারী ও পারসিক শুউবীরা সমানভাবে অংশগ্রহণ করে। তবে প্রতিবারই কোনো নেতার ইন্তেকালের পর তার বড় পুত্রের হাতেই নেতৃত্বের পতাকা অর্পণ করা হয়।
আলী ইবনু মুসা রেজা থেকে শুরু করে হাসান আল-আসকারী পর্যন্ত এই নেতৃত্বের ধারা অক্ষুণ্ন ছিল। এর পূর্বে, ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী, নেতৃত্বে ছিলেন রেজার পিতা মুসা আল-কাজিম, দাদা জাফর আস-সাদিক এবং পরদাদা মুহাম্মদ আল-বাকির। তবে লক্ষণীয় যে, উমাইয়া কিংবা আব্বাসি খেলাফতের বিরুদ্ধে তাঁদের কেউই কোনো বিদ্রোহাত্মক নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি।
২৬০ হিজরীতে হাসান ইবনু আলী আল-আসকারীর মৃত্যু বিদ্রোহীদের জন্য এক ভয়াবহ নেতৃত্ব সংকট সৃষ্টি করে। কারণ, তাঁর পুত্র তখনও দুধের শিশু মাত্র। এরই মধ্যে শিশুটির আকস্মিক মৃত্যু পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও সংকটাপন্ন করে তোলে। এই সুযোগে বিদ্রোহীরা অসংখ্য দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে দেখা দেয় ব্যাপক মতবিরোধ—যা একদিকে রাজনৈতিক ছিল, অপরদিকে শরীয়তের বিধান ও আকীদা-কেন্দ্রিক।
এই সব বিদ্রোহী দল ও উপদায়ের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি ও প্রভাব অর্জন করে যে সম্প্রদায়টি, তা হলো ‘ইসনা আশারিয়া’
✦ ৩য় পর্ব- শিয়াদের আকীদা: ইমামত, মাসূমতা, তাকিয়া ও রজআ — এক বিপর্যস্ত বিশ্বাস কাঠামো !✦
শিয়া মতবাদ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক চিন্তা নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে একটি স্বতন্ত্র ধর্মীয় বিশ্বাসপদ্ধতিতে, যার মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে এমন কিছু ভিত্তির উপর, যা কুরআন ও সহিহ হাদীসের সরাসরি বিরোধিতা করে। এ অধ্যায়ে আমরা পর্যালোচনা করব শিয়াদের আকীদার চারটি প্রধান স্তম্ভ, যা তাদের চিন্তার গভীরে লুকিয়ে থাকা বিভ্রান্তিকে উন্মোচিত করে।
এখনই শুরু করো !
শব্দ যখন অন্তর থেকে আসে, সে কখনো ক্ষীণ নয়।
চল এবার, একসাথে আলো ছুঁই।


Thanks everyday